সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পেশা- ৩

জব্বার মিয়া কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছে তার বউয়ের দিকে পাশের বাড়ির নূরুলের ফটকা ভাই ফারুক কুনজরে তাকায়। কুনজরের সংজ্ঞা অনুযায়ী তার পর্যবেক্ষণ সঠিক। এই নিয়ে জব্বার মিয়া কয়েকবার তার বউকে না করেছে যেন বাইরে কম বের হয়,কল থেকে পানি নেয়ার সময় যাতে গায়ের কাপড়-চোপড় ঠিক থাকে,বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় যাতে দরজা জানালা বন্ধ করে নেয়।

বেশকিছুদিন পরের ঘটনা, জব্বার মিয়া বাড়ি ফিরেছে সারাদিন পর রিকশা চালিয়ে। অন্যান্য দিনের মতো ঐ দিন দুপুরে সে বাড়ি ফিরেনি ভাত খেতে। ঘরে ঢুকে সে দেখে বউয়ের হাত ভর্তি চুরি আর কপালে তার চোখে জ্বালা ধরছে এমন একটা টিপ। জব্বার মিয়া সাজগোজের উপলক্ষ জিজ্ঞেস করতেই তার বউয়ের তৈরী জবাব-নূরুল ভাইয়ের বউ আমার লাইগা কিন্যা আনছে।

-কেন কেন,তোর লাইগ্যা হঠাৎ তার এতো দরদ উথলায়া পরলো কেন? নূরুল মিয়ার এমনিতেই তার বউয়ের সাজগোজ পছন্দ না। তার কথা হল-রিকশায়ালার বউ তুই কেন নবাবের বেটির মতো সাজবি। সেদিনও ঐ রকমই একটা কথা বলায় তার বউ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল-আমারে দুই ট্যাকা দিয়া চুলের ফিতা কিনন দেয়ার মুরোদ নাই আবার হের জ্বলতাছে! হেডম দেহায়া একটা ফিতাই কিন্যা দাও না। জব্বার মিয়ার হাত নিশপিশ করছিল এতক্ষণ, সুযোগে ছিল কখন মারা যায়। সে তার বউকে এহেন দাম্ভিক কথার জবাবে চড় মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ক্ষান্ত হল না কোমরে কয়েকটা লাথিও মেরে বসল। বলল- মাগির দেমাগ দেহ,আমার খায়া আমার পইড়া আবার তক্ক করে,এক্কেরে মাইরা লামু। বলেই তার বউয়ের গগণবিদারী চিৎকার যেন না শোনা লাগে সে জন্য ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।

গলির মুখের চায়ের দোকানে গিয়ে সে বনরুটি ছিড়ে খেতে খেতে দোকানদারকে চা দিতে বলল। পাশেই একদল যুবক তার ভাষায় ‘চ্যাংরা পোলাপাইন’ চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিল। এখন এই নির্বাচনের সময় বস্তির ছেলেগুলোর একটাই কাজ হল যে যখন বলবে মিছিলে যেতে তারা যাবে,বিনিময়ে কিছু মৌসুমী আয় হয় আর কী। জব্বার মিয়ার শরীরে নাঁচন উঠে এদের মিছিল দেখে। সেও মাঝে মধ্যে যেত তবে একবার পুলিশের বাড়ি খাওয়ার পর সে আর কোন মিছিলেই যায় না। অবশ্য নির্বাচনের মিছিলগুলায় পুলিশের আক্রমণ না হলেও অনেক সময় বিরোধী পক্ষের আক্রমনের আশঙ্কা থাকে। সে ভাবে এর চেয়ে তার রিকশা চালানো অনেক ভাল,টাকাটা হালাল হয়। পাশের বাড়ির নূরুলের ভাই ফারুকও এখন মিছিলে যায়,মারামারির দরকার হলেও তার ডাক পড়ে। একবার সে ফারুকের হাতে ইয়া লম্বা এক রামদাও দেখছে। যখন যে সরকার সেই নেতাদের হয়েই কাজ করে সে। বস্তির সবাই ফারুককে ভয় পায়। জব্বারের মনে হচ্ছে ফারুকই তার বউকে লুকিয়ে চুরি দিয়েছে। কিভাবে ব্যাপারটা ধরা যায় তা চিন্তা করতে করতেই জব্বারের পাশে নূরুল এসে বসে। নূরুলকে দেখে জব্বার সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেলে আসলেই তার বউকে নূরুলের বউ চুরি দিয়েছে কিনা। জবাবে নূরুল বলে-হেইডা বেডিগো ব্যাপার,হেরাই ভালা কইতে পারব।আমি ইতান জানিনা। নূরুল এরপর স্ব উদ্যোগে বলা শুরু করে-আমার খাডনিডা একটু কমছে ফারুক মানুষ হওয়ায়। হের কামাই অহন ভালই। নূরুল আরো জানায় ফারুক এখন দিনে হাজার পনেরশ টাকা কামাই করে। নির্বাচনের জন্য বস্তির সব ছেলেরই আয় ভাল। মিছিলে গেলেই পাঁচশ টাকা নগদ আর মিছিল শেষে এক প্যাকেট বিরিয়ানি বা তেহারি তো আছেই। এটাই এখন পেশা অনেকের। চা-নাস্তা খেয়ে জব্বার ঘরে যেতে যেতে ভাবে -ফারুকরে কিছুই কওন যাইব না,হের ম্যালা পাওয়ার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বেদখল

আমাগো বাড়ি দখল হয়া গেছে, আমগো বাড়ির চারপাশে এখন বাউন্ডারি বয়া গেছে। আমগো কইছিল হুমুন্দির পুত-'বাড়ি ছাড় নইলে লাস ফালায় দিমু' আমরা ক্যাচাল করি নাইকা, আমরা কইছিলাম- সময় দেন, আপসেই সইড়া যামু। আমগো সময় দেই নাইকা, আমরা আসমানের নিচে হুই, আমগো কেউ কয় আমরা ছিন্নমূল, কেউ কয় আবে বস্তিত গিয়া থাক,ঐ। আমরা মাথা নাড়াই, ভেজালের কারবার করিনা, আমার পোলা স্মাগলার, নইলে কিলার-শ্যুটার হইব, ভয় পায়না। আমগো বাড়ি দখল কইরা দেন, আমি আপনার শত্রুরে মাইরা দিমু, আমগো পোলাপাইন পড়া লেহা করব, ওগো মানুস বানামু।

ইন্দুর বিলাইয়ের গল্প

লেখালেখিকে যতটা সহজ ভাবা হয় আসলে তা ততো সহজ নয়। রাইটার্স ব্লক কয়েক দিন , কয়েক মাস , এমনকি কয়েক বছরও যেতে পারে। আবার এমনো হতে পারে এই জীবনে আর লেখা হবে না। ঠিক তেমনটাই হয়েছিল আজিজুল রহীমের সাথে। আমাদের জানামতে আজিজুল রহীম তার ডায়েরীতে সর্বশেষ লিখেছিলেন ১৯৯৭ এ। তখন তার বয়স বত্রিশ। সবে একটি নতুন চাকরিতে প্রবেশ করেছেন কয়েক বছরের পুরোনো পত্রিকা অফিস রেখে। একটি মাঝারি মানের প্রেসের ব্যবস্থাপক হিসেবে। সাড়ে চার বছরের অনিয়মতান্ত্রিক চাকরি ছেড়ে ৯ - ৫ টা অফিস আর শুক্রবার বন্ধ। এ যেন এক বন্দীশালা। তবুও ঠিকঠাক চলছিল ব্যস্ত জীবন আর সংসারের চাপে একটা আলাদিনের জ্বীন ভর করেছিল আজিজুল রহীমের কাঁধে।   আজিজুল রহীম তাঁর এনায়েতগঞ্জের বাসা ছেড়ে উঠেন সেগুনবাগিচায়। নতুন বাসাতে ওঠার পর থেকেই নতুন কিছু উৎপাত শুরু হতে থাকে। এক নম্বর সমস্যা হল ইঁদুর। এবং এই ইঁদুরগুলো সম্ভবত এনায়েতগঞ্জের সেই পুরোনো বাসারই পুরোনো সঙ্গী। আজিজুল রহীম রাত বারটায় যখনই শোয়ার জন্য মশারীর ভেতর ঢুকেন তখনই ইঁদুরগুলা তাঁর তোষক আর খাটের তল দিয়া নড়াচড়া করতে শুরু করে। আর এতে আজিজুল রহীম সাহেবের ঘুমাতে ঘুমাতে রাত তিনটা - চারটা বাজে।...

ট্রলার

পান চিবাইতে চিবাইতে আব্দুর রহমান বাড়ি ফিরে। দুপুরে খাবারের পর সে নিয়ম করে ঘর থেকে বাইর হয়, তা যতই বৃষ্টি হোক কিংবা ঠাডা পড়া রোদই হোক না কেন, রশিদের দোকান থেকে সে পান কিনে, হালকা জর্দা দেয়া, একটু চুন সাথে সুপারি দেয়া অর্ধেক পান খাবে সে এবং শেষ পিকটা ফেলবে সে তার বাড়ির দরজার পাশের দেয়ালে আর এভাবেই ঐ দেয়ালটার নিচের সম্পূর্ণ অংশ সবসময় লাল হয়ে থাকে। আব্দুর রহমান চল্লিশোর্ধ্ব, কোন কারনে সে এলাকায় গরুর ব্যাপারী হিসেবে পরিচিত, তাকে সবাই আব্দুর রহমান বেপারী ডাকে, তবে লোকে তাকে কেন গরুর ব্যাপারী ভাবে সে আজো ঠাওর করতে পারেনা, কোনদিন ঘোর লাগা এক বর্ষার রাতে সে কলিমুদ্দি ব্যাপারীর সাথে তাস খেলতে খেলতে হয়তো গরুর বেপার নিয়ে দুই একটা কথা বলছিল তাতেই কি লোক তাকে ব্যাপারী নাম দিল নাকি তা নিয়ে সে প্রায়ই ভাবে এবং ভাবতে ভাবতে কোন কুল কিনারা না করতে পেরে মাছের ট্রলার আজো কেন ফিরল না সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। আব্দুর রহমানের আসল কাজ মিয়া বাড়ির আটটা ট্রলার দেখা শোনা করা, এবং এই এলাকায় যে আর কারো দুই একটার বেশি ট্রলার সে বাড়তে দেয়না এইটা জানার কারণে মিয়া বাড়ির বড় মিয়া তাকে বেশ স্নেহ করে আর এই স্নেহ মাঝে মধ্যে বাড়...