শনিবার, ১৪ মে, ২০১৬

হারিয়ে যাওয়ার গল্প

স্টেশন থিকা ট্রেনটা যখন চলা শুরু করল তখন আমি জানালা দিয়া গলা বাইর করে দিলাম। আস্তে আস্তে গোবরের গন্ধ,ময়লার গন্ধ,মানুষের গন্ধ নাক থেকে হারায় যেতে লাগল আর নাকে বাড়ি দিতে লাগল ভেজা খড়,ধান আর পুকুরের মাছের গন্ধ,পানির গন্ধ। ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে আইসা আমি টিকেট কাটলাম সিলেটের জন্য। শোভন চেয়ার, সিটের হাতল ভাঙ্গা,এইখান সেইখান থিকা ফোম উইঠা গেছে,মাথার উপরে ফ্যান আছে কিন্তু তার সুইচটা ভাঙ্গা,কখনো সখনো বাইরের বাতাসে ফ্যানের পাখা ঘুরতে লাগল আর তাতে এক অদ্ভুত শব্দ হইতে লাগল। আমি ভাবতে লাগলাম সিলেট কতদূর, আবার ফিরা আসতে পারব তো? আমরা থাকি মিরপুর,পীরেরবাগ। সিলেট আমার দাদাবাড়ি,সারাজীবন বাবা-মা’র সাথে রোজা কিংবা কোরবানির ঈদে চার-পাঁচ দিনের জন্য সিলেট আসতাম। নানাবাড়ি ঢাকায় হওয়ার কারণে একটা ঈদ ঢাকায় করতে হয়,আরেকটা সিলেটে। আমার দাদার ধারণা সে খুব শীঘ্রই সে মারা যাবে তাই সব ঈদের আগে তার মনে হয় এইটাই তার জীবনের শেষ ঈদ। যদিও এখনো তিনি বাঁইচা আছেন,অসুস্থ্য তবে মৃত্যুশয্যায়ী না।
আমার এইবার আচানক সিলেত রওনা দেয়ার ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক,কেননা আমি কখনোই এইরকম একলা সিলেট কী জয়দেবপুর পর্যন্ত যাই নাই। বাপ-মা’ ছাড়া আমি আমার জীবনের কোন দিন পার করি নাই,এমনকি বাসা থিকা বাইর হওয়ার আগে বইলা বাইর হই কয়টার সময় ফিরব। এইটা একপ্রকার অনুমতি,পরোক্ষভাবে মা’র কাছ থিকা অনুমতি নেওয়া,তার যদি আপত্তি থাকে তবে আমি নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরা আসব।
গেল মাসে সিলেট থিকা ঢাকা আসার সময়ে আমার সাথে এক মেয়ের প্রেম হয়ে গেছে। আমি তারে চিনিনা,খালি চোখাচোখি হইছে কিন্তু আমার মনে হইতাছে তার সাথে আমার জনম জনমের প্রেম। আমি উদাস হয়া বাইরে তাকাই,ট্রেন ভৈরব ব্রীজে উঠে। আমি ঘুটুর মুটুর শব্দের সাথে রঙ চা খাই কাটলেট দিয়া। ছোটবেলা থিকা খায়া আসতাছি একই স্বাদের আর একই সাইজের কাটলেট। চা খায়া একটা সিগারেট ধরাই,আমি ধোঁয়াগুলারে মেঘের সাথে উঁড়ায় দিতে ভাবি মেয়েটার কথা। ভাবি মেয়েটার চোখ দুইটার কথা, কী এমন ছিল ঐ দুই চোখে যে আমি তার প্রেমে পড়লাম আর আমারও মনে হইতে লাগল আমাদের প্রেম হয়া গেছে। গোবিন্দ আর রাভিনা ট্যান্ডনের একটা ছবি দেখছিলাম। ছবিতে দুইজন দুইজনের দিকে তাকায় থাকে আর তাদের মনে গান বাজে, গান শেষে তারা ঠিক ঐভাবেই তাকায় ছিল। আমিও রিকশায় ঊঠতে উঠতে মেয়েটারে দেখতে ছিলাম জিন্দাবাজার মোড়ে,মেয়েটা ঠিক ব্লু ওয়াটার মার্কেটের সামনে নাইমা পড়াতে আমি লাফ দিয়ে ফুটপাতে নাইমা রিকশাওয়ালার হাতে বিশ টাকার একটা নোট দিয়া রাস্তা পার হয়া গেলাম।
আমার ভাবনায় ট্রেনের টিটি ব্যাঘাত ঘটাইল,এই মাঝ রাস্তায় সে কই থিকা উদয় হইল জানতে চাইলাম। সে আমারে হাইকোর্ট দেখায় বলল এইটাই নাকি নিয়ম,আমি টিকিট দেখায়া আবার একটা বিড়ি ধরাইলাম। আজকাল বাসে ট্রেনে কেউ সিগারেট খায়না। পাশের সিটের আঙ্কেলও মনে হয় আমারে দেইখা সাহস পাইল,ব্যাটা এতক্ষন নাক ডাইকা ঘুমাইতেছিল। জিজ্ঞাস করল-খই যাইবা? আমি সিগারেটটা বাম হাতের আঙুল দিয়া ঢাইকা জানালার বাইরে নিয়া গেলাম। বল্লাম-সিলেট। -সিলেট খই? –জ্বী টাউন। -তে টাউন খই বা?-জ্বী শিবগঞ্জ। -আইচ্ছা, ঢাকাত কীতা,বেড়ানিত নি? – জ্বী অয়, বেড়ানিত। আপদটারে সাইড করানোর জন্য আমি সিগারেটে লম্বা টান দিয়া চাপা শক্ত কইরা রাখলাম, যেন খুব মেজাজ খারাপ,ভদ্রতার মায়রে বাপ। ভদ্রলোক আর কথা বাড়াইল না ।
ব্লু-ওয়াটার মার্কেটের উপরে ফাস্টফুডের দোকান, মেয়েটারে ফলো করতে করতে আমি সেই দোকানে ঢুইকা পড়ছিলাম। সে তার বান্ধবীদের সাথে খাইতে আসছে, বুঝলাম তার জন্মদিন, সবাই হ্যাপি বার্থডে গান গায়া উঠল, কেক কাটল, আমি দূরের টেবিলে বসলাম। ওয়েটার ম্যানু দিয়া গেল,আমি ভাব দেখাইলাম কেউ একজন আসবে , আমি যেন তার অপেক্ষাতেই আছি। পকেট থিকা মোবাইল বাইর করলাম,তখন সেলফির যুগ ছিলনা, ক্যামেরা ওয়ালা মোবাইল কিন্তু আমি ছবি তুলিনা, ভিজিএ ক্যাম, মার্কেটে সাইবার শট,ফাইভ ম্যাগাপিক্সেল, আমি স্লাইড উঠাই আর নামাই, তখন এইটাই ভাব। আমি মেয়েটার উলটা দিকে বসছি,অত্যন্ত সুন্দর মেয়ে কিন্তু মুখ দিয়া যখন বাইর হইল সিলেটি ভাষা আমি হতাশ হয়া পড়লাম। আমার মনে হইল আমি হুদাই টাইম নষ্ট করছি,এর চেয়ে রাজা ম্যানশনে গিয়া বই কিনাই ভাল। ভাবতে ভাবতে আমি উঠতে যাব এমন সময় সে শুদ্ধ ভাষায় ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করল তাদের দশজনের কোন সেট ম্যানু আছে কিনা,ড্রিংক্স আর চিপস কম্বো দিবে কিনা। আমি ঢোক গিলা কফি আর স্যান্ডুইচ অর্ডার করলাম। মেয়েটার দিকে আমি সরাসরি যতবার তাকাইছি ততোবার সে আমারে খেয়াল করছে, চোখে চোখ পড়ছে। আমি রোমাঞ্চিত অনুভব করলাম, আমি ভাবলাম –এইতো আমার প্রেম হয়া গেছে, আমি বিরাট খেলোয়াড়। খেলারাম খেলে যা।

ট্রেন শ্রীমঙ্গলে আসার পর বাসা থিকা ফোন আসল, আমি আমার মা’রে বললাম-আমি আমার এক বন্ধুর বাসায় আসছি, রাতে আসব না, মা অবাক হয়া বারবার জিজ্ঞাস করতে লাগল আমি মিথ্যা বলতাছি কেন, তার ধারণা শক্ত হতে লাগল আমি কোন মেয়ের পাল্লায় পড়ছি আর তারে নিয়া ঢাকার বাইরে পালায় যাচ্ছি। আমি বললাম –বাসায় ফিরা পুরা কাহিনী বলব,এখন রাখি। পাশের আঙ্কেল মৌলভীবাজারের লোক, পরে আলাপে জানলাম সে ঢাকায় চাকরি করে, রবি টু বুধ ফুল অফিস কইরা বৃহস্পতির হাফ ডে-তে সে রওনা দেয় বাড়িতে । ভাবলাম কী নিষ্টূর জীবন, বউ বাচ্চার জন্য প্রতেক সপ্তাহে আসে, আমার একদিনেই কেমন জানি বিরক্ত লাগতাছে।  দুপুরের ট্রেন, পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে রাত ১১টা বাজল। আমি স্টেশন থিকা রিকশা নিয়া শিবগঞ্জ আমার চাচার বাড়িতে হাজির হয়া গেলাম, তারা সবাই ঘুমায় পড়ছিলেন। আমারে এইভাবে দেইখা ভাবলেন বুঝি বাড়ি থিকা রাগ কইরা আসছি। বললাম, একটা চাকরির ইন্টারভ্যিউ,শুইনা তারা খুশি হইলেন এবং আমারে ভরসা দিলেন যে চাকরিটা আমার অবশ্যই হবে। আমি ঢাকায় পড়াশোনা করা ছেলে আর আমার সিলেটে চাকরি হবে না তা হতে পারেনা।
সকালে উইঠাই আমি নাস্তা খায়া জিন্দাবাজার গিয়া হাজির হইলাম। শুক্রবার তাই ব্লু ওয়াটার মার্কেট খুলে নাই,এরা নাকি শুক্রবারে মার্কেট বন্ধ রাখে। আমি মার্কেট মালিক সমিতিরে মা-বাপ তুইলা গালি দিয়া রাজা ম্যানশনে গেলাম, বইপত্রের মালিক দম্পতির সাথে দেখা। তাদের সাথে আমার আগে থিকাই খাতির,কথা বার্তা বলতে বলতে জানতে পারলাম সিলেট শহর এখন অনেক ব্যস্ত শহর আর প্রচুর নন সিলেটি দিয়া সিলেট ভইরা গেছে। সিলেটের লোকাল লোকজন বাইরের এই অনাহুত নাগরিকদের পছন্দ করেনা। বড় বড় চাকরি,সরকারি পদ এখন বাইরের লোকজনের দখলে, আত্মীয়করণে তারা আরো সজাগ, তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী এখন এই সিলেট শহরে ঘাটি গাড়তাছে চাকরির আশায়। আমি এইসব ফাউ প্যাঁচালের মধ্যে না গিয়া বাইরে যাই, তারপর মার্কেটের ছাঁদে উঁঠি, সিলেটের শিক্ষিত আর বইপড়া পোলাপাইন, বিশেষ কইরা যারা ভার্সিটিতে পড়ে তারা এই মার্কেটে বই কিনতে আসে, তাই ছাঁদে তারা চা-বিড়ি ফুঁকে, ছোট আড্ডা হয়া যায় এক্টা,দুই একজন লেখালেখির জগতে হাত পাকাইতাছে লিটল ম্যাগের মাধ্যমে, আমি তাদের সিগারেট খাওয়াই, ঢাকায় যাওয়ার দাওয়াত দিয়া ছাঁদ থিকা নাইমা পড়ি। ভাবি ঐ মাইয়ার সাথে আমার দেখা হবেনা। হুদাই হাঁটতে হাঁটতে চৌহাট্টার মোড়ে যাই,কোনার ফুলের দোকান থিকা দুইটা গোলাপ কিনি ত্রিশ টাকা দিয়া, ভাবি শাহবাগে এরচেয়ে সস্তায় পাইতাম। আমারে আমার চাচাতো ভাই ডাক দেয় দূর থিকা আমি হাত দেখায়া সামনে যাই,সে আমারে আবিষ্কার কইরা মহা পন্ডিতি দেখানো শুরু করে, ভাব এমন সব বুইঝা ফালাইছে, এই শুক্রবারে কোন ইন্টারভ্যিউ না আমি আসলে নারী ঘটিত কারণের তাদের শহরে আসছি। আমি তারে পাম-পট্টি মাইরা ভাগাইতেই সেই মেয়ে রিকশা কইরা আমারে ক্রস করল। আমি ভ্যাবলার মত চায়া শুধু তার হারায় যাওয়া দেখলাম, আর সিলেট শহর এমনি শহর আপনি রিকশা দুই ঘন্টায়ও পাইবেন না। অগত্যা আমি হাঁটা ধরলাম মেডিক্যাল বরাবর,কারণ মনে হইল সে ঐদিকেই গেছে।

সিলেট শহর আসলেই ব্যস্ত, গাড়ি-রিকশার হুরোহুরি কিংবা মানুষের গতি ঢাকার মতোই। আমি হাঁটতে হাঁটতে মেডিক্যালের সামনে গেলাম, দেখলাম পুরা এলাকা খালি, এই সকাল বেলা দুইটা কাউয়া ছাড়া আর কেউ নাই। আমি নিরাশ মনে সিগারেট ধরাইলাম, পাশের চায়ের দোকান থিকা চা খাইলাম, দেখি দুই এক ঘন্টা অপেক্ষা করি। ঐ দিন ব্লু-ওয়াটারের কথা মনে পড়ে। তারে আমি বারবার দেখার ফলে সে তার দল-বল নিয়া তাড়াহুড়া কইরা খায়া কাইটা পড়ছিল,আমি ভয়ে আর ফলো করতে পারিনাই। আজকে আমি বখাটে পোলাপাইনের মত আচরন করব, দেখি যা হওয়ার হবে। কিন্তু আমার আশায় গুড়েবালি হইতে লাগল, আমি তারে পাইলাম না। বহুক্ষণ পর দেখি সে হাসপাতাল থিকা বাইর হইল, আমি নিজের সিক্স সেন্সে নিজেই অবাক হইলাম। আমি জানিনা,আমি কেন এইখানেই আসলাম,এইটাও জানিনা সে এইখানে কী করে। আমি তারে ডাকলাম, সে রিক্সা খুঁজতাছিল, তারে বললাম এইখানে রিক্সা পাবেন না,চলেন সামনে আগায় যাই। সে আমারে জিজ্ঞাস করল-আমি কী আপনারে চিনি? জবাবে আমি না সূচক মাথা নাড়ায়া বললাম, আমি আপনারে চিনি, এইটাও জানি আপনে ব্লু-ওয়াটারে ফাস্টফুড খাইতে যান। সে আমারে অবাক কইরা দিয়া বলল, সেইদিন সে আমারে খেয়াল করছে কিন্তু আমি যে তারে ফলো করি এইটা সে পছন্দ করতেছে না। আমি তারে পুরা কেস খুইলা বললাম, কিরা কসম কাইটা বললাম আমি তারে ভালবাসি, তার প্রেমে পইড়া গেছি। আর আমার কখনই কারো সাথে প্রেম হয়নাই এই জীবনে। সে যে আমারে খুব একটা পাত্তা দিতে লাগল তানা। আমি নাছোড় বান্দা তার পিছে রইলাম। সে একটা রিক্সা পায়া উইঠা গেল কিন্তু রিক্সাওয়ালা টানলনা আর আমিও লাফ দিয়া রিক্সায় উইঠা গেলাম। আমি বললাম –এট লিস্ট তোমার নামটা আমাকে বলো। সে ইতস্তত কন্ঠে জানালো তার নাম-শিখা। শিখা নামটা শোনার সাথে সাথে আমি শক খাইলাম,কারণ আমার আগের গার্লফ্রেন্ডের নাম ছিল শিখা।আমি লাফ দিয়া রিকশা থিকা নাইমা গেলাম,দেখলাম শিখা অবাক হয়া পেছনে তাকায় আছে,রিক্সা যাইতে লাগল,রিক্সা মিলা গেল একসময়,আমিও শিখারে হারায় ফেললাম।  

সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০১৫

আমার ব্যস্ত আকাশ বৃষ্টি ঝড়ায় না,
মেঘগুলি ছুঁটে বেড়ায় ইতিউতি।
আমার আঁঙ্গিনায় নারীরা ঘুরে বেহিসাবি,
পুরুষের চোখ মার্জিত,নারীরা স্বীকৃত।

দুই টুকরো কাগজে লেখা শব্দগুচ্ছ
আমাকে পোঁড়ায়, তাতিয়ে বেড়ায় সারা বেলা।
লাল ঘুড়িটায় টান পড়ে
আর গভীর রাতে তারারা তুচ্ছ।

চুপচাপ থাকতে থাকতে সময়টা বন্ধ্যা
আর গলাটা নিম্নস্বরে চিহিঃ চিহিঃ
আমাকে উঠতে দেয়না ওপরে
কিংবা নামতে দেয়না সন্ধ্যা।

আমি বাসন্তি শাড়িতে রোমান্স খুঁজিনা
আমি চাই মদিরার প্রশান্তি।
আমায় এক টুকরো চাদর দাও,
আমায় দাও এক চিলতে হাসি !



বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নিমাইকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন



সময়টা তখনও দুপুর হয়নি,কৃষক নিমাইকে উষ্কখুষ্ক অবস্থায় মাঠে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কেউ হয়তো তাকে খেয়াল করছে, কেউ হয়তো করছে না। নিমাইয়ের পাশের ক্ষেতে চাষীরা কাজ করছে। এমন কর্মব্যস্ত দিনে নিমাইকে গালে হাত দিয়ে আকাশ পানে চেয়ে থাকতে দেখে কারো মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে, কারো হয়তো জাগছে না। পাশের ক্ষেতগুলোতে  কাজ করছে ভূমিহীন বর্গাচাষী ইদ্রিছ মিয়া,দীর্ঘদেহী সোলায়মান আর প্রাণেশ। তারা কেউ কেউ নিমাইয়ের কুশল জিজ্ঞাসা করে, কেউ করেনা। 

নিমাই একজন বর্গাচাষী এবং অবশ্যই অস্বচ্ছল। অভাব অনটন যে তার এবং তার জাতের নিত্যসঙ্গী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্গাচাষীদের নিজের জমি থাকে না,অন্যের জমিতে তারা চাষ করে বিনিময়ে অর্ধেক অথবা তিন ভাগের এক ভাগ ফসল পায় এবং তা দিয়ে তাদের সারা বছরের অভাব কোনক্রমেই ঘুচে না। তাদের বছর বছর বংশ বৃদ্ধি পায়, প্রবীন একজনের হয়তো মৃত্যু হয়,যুবক আর কিশোরীদের বিয়ে হয়,যুবতী বোন হয়তো স্বামী পরিত্যাক্তা হয় কিন্তু তিন অক্ষরের অভাবটাই ঘুচে না।

 
নিমাইয়ের ঘরে স্বাভাবিকভাবেই হোক অথবা বাধ্য হয়েই হোক এক বউ। মুসলমান হলেও সে দুই অথবা তিন বউ রাখতে পারত না। এর জন্য আর্থিক সঙ্গতি তো লাগেই শারীরিক সঙ্গতি না থাকলেও বউ পালা যায় না। নিমাইয়ের দ্বিতীয়টা থাকলেও প্রথমটা তার জাত গোষ্ঠীর কারোরই নেই। নিমাইয়ের যে বহুগামীতায় অরুচি নেই,কিন্তু মালের সাথে কড়িও তো থাকতে হবে। এছাড়া নিমাইয়ের ঘরে মা,ছোট বোন তো আছেই। কোনদিন আবার বড় বোনটা বিধবা হয়ে অথবা স্বামী পরিত্যাক্ত হয়ে ফিরে আসে তাও কী নিমাই ভাবছে?

নিমাইকে মাঠে বা ক্ষেতে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে চাষীদের কেউ কেউ হয়তো ভাবে তার বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে। কেউ হয়তো ভাবে নিমাইয়ের অসুখ করেছে কিংবা গা টা একটু ম্যাজম্যাজ করছে। আসলে নিমাইয়ের কী হয়েছে তা কেউ জানে না, হয়তো কেউ কেউ কিংবা সবাই আন্দাজ করতে পারছে। নিমাই কী আসলে তখন আকাশ দেখছিল নাকি মেঘহীন আকাশে তখন সে স্বপ্ন বুনছিল? নাকি প্রতিনিয়ত যুদ্ধের পূর্বে সে যে প্রস্তুতি নেয় সেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল? নাকি সে ক্রমাগত বিধাতাকে জিজ্ঞেস করছিল কবে সে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতে পারবে? এরকম অনেক প্রশ্ন আমাদের আর চাষীদের দরজায় কড়া নাড়ে।  

নিমাই সকালে ভরপেট খেতে পারেনি। রুচি হচ্ছিল না বলে নয় কিংবা তাই-ই হতে পারে। অথবা নিমাইয়ের ঘরে চাল,মুড়ি,চিড়া কোনটাই ছিল না।  নিমাইয়ের বউয়ের নাম সীতা। ছোটবেলায় রামায়ন শুনে শুনে নিমাইয়ের চোখে ভাসত যে সীতা ঠিক সেরকমই মায়াবী দেখতে তার সীতা। নদীর জলের মতো স্বচ্ছ চোখ, সারা শরীরে যেন ঢেউ বয়ে যায়,কোমল ঘাড় আর বাহু,পীনোন্নত বুক,বড় নাভিমূল,কমলার কোয়ার মত ঠোট যুগলে হাসি লেগেই থাকে সারাক্ষণ। নিমাই কী এখন বসে বসে সীতার কথাই ভাবছে? নাকি মালতীর কথা? মালতী নিমাইয়ের পিসতুতো বোন। বিয়ের আগে সে মালতীর দিকে তাকাতোই না। কিন্তু যেই মালতীর বিয়ে হয়ে গেল সেই কিশোরী বয়সে তারপর থেকেই নিমাই নিঃসঙ্গ বোধ করতে লাগল। নিমাই তখনো বিয়ে করেনি , বিয়ের মত বয়স অবশ্য হয়নি কিন্তু নারীদেহ চিনতে পারার মত বয়স তার হয়েছিল। বিয়ের পর মালতী বাপের বাড়ি আসত যখন তখন নিমাই খেয়াল করত মালতীকে খুব গভীর ভাবে। প্রতিদিনই যেন মালতীর রূপ বাড়ছে। তার প্রায় অদৃশ্য স্তন দুটি হয়ে যাচ্ছে ডাবের মত যা কয়েকদিন আগেও ছিল বাতাবি লেবু। হয়তো নিমাই এসবের কিছুই ভাবছে না। 

নিমাইয়ের গলায় গামছা,পরনে জীর্ণ একটা লুঙ্গী। মাঠে কাজ করার সময় সে কিছু গায়ে দেয় না  কিন্তু নিমাই তো আজ কোন কাজই করছে না। নিমাই কী ভাবছে তার পুরোনো বন্ধু মিহির মাঝির কথা? মিহির মাঝি গেল বার গাঙে ডুবে মারা গেল তখন নিমাই কী কান্নাটাই না কাঁদল ! অথচ মিহির সাঁতার জানত সবার থেকে ভাল। ছোটবেলা থেকেই নদীতে সাঁতার কাটত। নাকি নিমাই তার বড় মেয়ে শ্যামার কথা ভাবছে যে কিনা এখন সাতে পড়েছে? এতটুকুন মেয়ে অথচ কী সুন্দর চুল ! এতো বড় চুলগুলোকে যখন ও খোপা করে তখন নিমাইয়ের চোখে মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে, সে একবার মাকে দেখে আরেকবার মেয়েকে। বয়সের ব্যবধান কত ! অথচ চেহারায় কত মিল ! 

নিমাই আর সীতার যেবার বিয়ে হয়েছিল সেবার প্রচন্ড শীত পড়েছিল । ফুলশয্যার রাতে সীতা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। নিমাই যেই কুপিটা একটু কমাল সেই সীতার ঠকঠকানি আরো বেড়ে গেল। নিমাই সীতাকে জড়িয়ে ধরে বলল- বউ কাপিসনে,আমি তোকে কামড়াব না। নিমাই কী এখন একটু হাসছে? হয়তো নিমাই এটাও ভাবছে না। আশে পাশের বর্গাচাষীদের কেউ কী খেয়াল করে নিমাই ঘামছে,দরদর করে ঘামছে? হয়তো কেউই খেয়াল করে না। নাকি নিমাই ভাবছে গতরাতের কথা যখন নিমাইয়ের কানে কানে ঘর্মাক্ত ও তৃপ্ত সীতা বলেছিল – আরেকডা ছাওয়াল আইসছে পেটে। নিমাই কী তাই ভাবছে? হয়তো হ্যাঁ অথবা না।    

রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

অনুতাপ- ১

আমার ঘরের জানালায় একদল মেঘ আসে
ওরা যাত্রাবিরতী করে জানালার কার্ণিশে
কথা বলে,গল্প করে
আমাকে শোনায় ওদের পিছনের কথা,
কতটুকু পথ পেরিয়ে এল; সে কথা।
যুবক মেঘ আমায় ডেকে নিমন্ত্রন দেয়-
ওদের সাথে চলবার।
আমি গাঢ় হাসি দেই
ওদের চলবার,ভেসে যাওয়ার গল্প শুনি
আমার কাছে ওরা পঙ্খীরাজে চড়া রাজপুত্তুর।
আমি ঘরের দেয়ালে ওদের কাব্য লিখে দেই
আরো লিখে দেই-
‘আমিও যেতে চাই মেঘদলের সাথে
মেঘকন্যার সাথে,ঐ যুবকটার সাথে’
কিন্তু যেতে পারিনা,পারবনা।
আমাকে কে যেন ধরে রাখে
মনে হয়,কেউ যেন ডানা দিয়ে আঁটকাচ্ছে
আমি বাঁধনহারা হইনা তবুও
হয়তো বেসেছি ভাল অদৃশ্য শেকলটাকে
কিংবা রাঙা মুখ,সুতি শাড়ির আঁচল।

শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৩

মধ্যযুগের আধুনিক শব্দ সৈনিক-তোমাদের অভিবাদন !





আমরা সাফল্যের সাথে পৌঁছে গিয়েছি মধ্যযুগে
আধুনিকতার পোষাক পড়ে।
যেখানে ল্যাপটপ-ডেস্কটপের সাথে ছবি
মাথা নিচু শব্দ সন্ত্রাসী।

আমরা খুঁজে পেয়েছি অনেক অনেক অস্ত্র
আগে অস্ত্র বলতে বুঝাতাম রামদা-চাপাতি কিংবা কালাশনিকভ
এখন অস্ত্র মানে এক্সটারনাল হার্ডডিস্ক, কিউবির মোডেম।
মাথা নিচু শব্দ সৈনিক।

মাথা থেঁতলে দিল যারা পুলিশের
তারা ধরা পড়ল না।
পুলিশের রেশন বাড়ানো উচিত এমন চিন্তাকারী
ভয়ে উঠে যায় ডিবি'র মাইক্রোতে।

ধরা পড়লনা বাসে যে আগুন লাগালো
ধরা পড়ল সুব্রত শুভ
সমস্ত অশুভ শব্দ উচ্চারণকারী
বিপ্লবদা,জানি উঁনি সদ্যবিবাহিত।

মধ্যযুগে এখন আমরা পাথর ঘষি
নিঃশঙ্কচে মেরে ফেলি আপন প্রজাতির বাইসন
ঘরে এনে পুষতে থাকি
গন্ধে ভরা কতগুলো শেয়াল।

কবির খাতা কবি বেঁচে দিবে
সুব্রতের ল্যাপটপ সুব্রত বেঁচে দিবে
আরজ আলি মাতুব্বর সব বই জ্বালিয়ে দিবে
আমরা ঘুমাবো অবার্চীনের মত,
তুমি পাহারা দিও,গড়ে তোল স্বপ্নের পাক ভূমি।

3 April 2013

রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১২

পঙ্গু রাষ্ট্রের পঙ্গু শত্রু


“ ঝালকাঠীতে র‌্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে পা হারানো কলেজছাত্র লিমন হোসেনের বাবা ,মা ও ভাইসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন র‌্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচিত ইব্রাহিম হাওলাদার। বৃহস্পতিবার ঝালকাঠী জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের আদালতে করা এই মামলায় ইব্রাহিম তার শ্যালক ফোরকান হাওলাদারকে হত্যার অভিযোগ এনেছেন, যিনি তিন দিন আগে মারা যান। মামলায় লিমনের বাবা তোফাজ্জেল আকন, মা হেনোয়ারা বেগম ও বড় ভাই সুমন আকনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। ঈদের দিন বিকালে লিমন ও তার মায়ের ওপর হামলার অভিযোগে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাজাপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন হেনোয়ারা বেগম। ওই হামলার কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থল থেকে এক কিলোমিটার দূরে ইব্রাহিমের শ্যালক ফোরকানের (৩৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তার লাশের ময়নাতদন্তও হয়েছে। লিমনের ভাই ও তার আত্মীয়-স্বজনদের হামলায় ফোরকান মারা গেছেন দাবি করে ইব্রাহিমের স্ত্রী লিলি বেগম মঙ্গলবার থানায় একটি অভিযোগ করলেও পুলিশ তা অপমৃত্যু মামলা হিসাবে গ্রহণ করে।”                                    - সূত্রঃ বিডিনিউজ ২৪ ডট কম।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে কে বা কারা ইব্রাহিমের শ্যালককে হত্যা করল? এটাতে কি আদৌও লিমন বা তার আত্মীয় স্বজনের যোগসাজশ আছে কিনা ? অত্যন্ত হাস্যকর হলেও করুণ যে লিমনের পরিবারের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের হয়েছে। মামলায় আরো আসামী থাকলেও লিমনের পরিবারের তিন সদস্যকেই প্রধান আসামী করা হয়েছে । আরো হাস্যকর, ঘটনার সময় লিমনের মা ও লিমন হাসপাতালে ছিল আর লিমনের বাবা  ছিলেন ঢাকায়। উল্লেখ্য যে, ঈদের দিন বিকালে লিমন ও তার মায়ের উপর হামলা চালায় ইব্রাহিম যে কিনা র‍্যাবের সোর্স এবং একই সাথে স্থানীয় মাস্তান।

গত বছর ঝালকাঠির লিমন মাঠে গরু আনতে গিয়ে লিমন র‍্যাবের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয় এবং একটি পা হারায় । র‍্যাব নামক রাষ্ট্রীয় এই লাঠিয়াল বাহিনী ঐ ঘটনার পরে ক্ষমা প্রার্থনা তো দূরে থাক উল্টো একের পর মিথ্যা মামলা দিতে থাকে লিমন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। লিমন ও তার পরিবারকে দেয়া হচ্ছে হত্যার হুমকি। তাদের বলা হয়েছে মিডিয়ার ফোকাস একটু কমে গেলেই তাদের মেরে ফেলা হবে। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে সরকার ও রাষ্ট্রের সমর্থনেই এসব হচ্ছে । গণমাধ্যমগুলোতে একের পর এক প্রতিবাদ করার পরও আদালত , রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কারোরই কোন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না ব্যাপারটায়। এবং রহস্যজনক ভাবে নির্লিপ্ত আমাদের সুশীল সমাজ । যেন আমরা এক মগের মুল্লুকে বাস করছি, দেশটা যেন একটা শিশু পার্ক যে যেমন ইচ্ছে খেলছে !
লিমন ইস্যু এখন কোন এলিট বাহিনীর সাথে কোন সাধারণ নাগরিকের ইস্যু নয়। এটা এখন মানবতার সাথে অমানবিকতার ইস্যু। এটা এখন কোন ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা রাষ্ট্রের নগ্নতার বহিঃপ্রকাশ । রাষ্ট্র নগ্ন হলেই সম্ভব এমন হীন কাজ করা। রাষ্ট্র দলবাজী,সন্ত্রাসের মদদদাতা হলেই সম্ভব ন্যাংটো হয়ে যুদ্ধ ঘোষণার। যুদ্ধটা কার সাথে? একজন গরিব,রাষ্ট্র দ্বারা পঙ্গু ছেলের সাথে ? নাকি নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ হবে বলে অত্যাচারের মাত্রাটা বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে? রাষ্ট্র কি তবে অসহায় ? নাগরিকদের অসহায় করে রাখার মধ্যেই ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রের জয় ?

লিমনের স্বপ্ন ছিল, সে সাধারণ ছাত্র। সে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন করত না । সে পড়াশোনা করত, গরিব পরিবারের সন্তান বিধায় তার সুযোগ-সুবিধা কম ছিল। কিন্তু সে কেন রাষ্ট্র কর্তৃক বারবার অপদস্থ হবে, রাষ্ট্রের এই ক্ষমতা কে দিয়েছে ? তাহলে একটি অগণতান্ত্রিক দেশের সাথে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পার্থক্যটা কোথায় ? মহাজোটকে মানুষ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল তাদের অপূরণীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এটা কী আমাদের স্বপ্ন ছিল ? এই মহাজোট তাদের নির্বাচনি ম্যানুফেস্টুতে বিনাবিচারে হত্যা বন্ধ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই তার প্রতিশ্রুতি !


একজন পঙ্গু নাগরিক যখন রাষ্ট্রের প্রধানতম শত্রু বলে বিবেচিত হয় (অন্তত আচরণে) তখন আমার এই রাষ্ট্র, সরকার, সরকারের সামরিক-আধা সামরিক বাহিনীসহ গোটা রাষ্ট্রকে পঙ্গু বলতে দ্বিধা হয়না। লিমন একজন অসহায় নাগরিক, তাকে সাহায্য বা সাহস দেবার কেউ নেই । কিন্তু তার চেয়েও বড় অসহায় আমাদের বাংলাদেশ নামন রাষ্ট্রটি। মান বাঁচাতে এখন তার জান নিয়ে টান দিতে হচ্ছে। কার জান? – যারা তাদের ক্ষমতা দিয়েছে, স্বপ্ন বাঁচানোর জন্য। এই সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিচার হবে বলে আশা রাখিনা। বেশিরভাগ রাষ্ট্রীয় অপরাধ-সন্ত্রাসের বিচার হয়না। রাষ্ট্র তখনই পরাক্রমশালী যখন তার নাগরিকদের অধিকার সমুন্নত থাকে,গরিব ও মেহনতি মানুষ সুখে থাকে। আর রাষ্ট্র তখনই পঙ্গু হয় যখন পঙ্গু লিমন তাদের শত্রু হয় ।  

https://www.facebook.com/notes/sayem-choudhury/%E0%A6%AA%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A7%81-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A7%81-%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%81/10151124076934182
http://www.mongoldhoni.net/2012/08/26/lame-enemy-of-lame-state/